জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন: জলাতঙ্ক সম্পর্কে আপনার যা অবশ্যই জানা উচিত
![]() |
| বাংলাদেশী জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন ( Rabix- vc : Incepta Pharma) |
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা, প্রতিরোধ ও প্রতিকার
জলাতঙ্ক কী?
জলাতঙ্ক (Rabies) একটি প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর এই রোগে মৃত্যুহার প্রায় ১০০%। তবে সঠিক সময়ে এবং সঠিকভাবে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন বা টিকা গ্রহণ করলে এটি শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
খাবারের আগে নাকি পরে ওষুধ? কোন ওষুধ কখন খেতে হয় এবং কেন?
জলাতঙ্ক রোগের কারণ ও বাহক প্রাণী
জলাতঙ্ক মূলত 'র্যাবিস ভাইরাস' (Rabies Virus)-এর কারণে ঘটে। সংক্রামিত প্রাণীর লালায় এই ভাইরাস থাকে এবং কামড়, আঁচড় বা ক্ষতস্থানে লালা লাগলে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রেসক্রিপশনে ব্যবহৃত ৫০+ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও Abbreviation-এর অর্থ
যেসব প্রাণীর মাধ্যমে এটি ছড়ায়:
- গৃহপালিত ও পোষা প্রাণী: কুকুর, বিড়াল।
- গৃহপরিবেষ্টিত ও গবাদি পশু: গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া, গাধা।
- বন্য ও অন্যান্য প্রাণী: শেয়াল, বানর, বেজি, বাদুড়, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, বনবিড়াল, খরগোশ।
জলাতঙ্কের লক্ষণসমূহ
কামড় বা সংক্রমণের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সাধারণ ৩ থেকে ১২ সপ্তাহ (কখনো কখনো ১ বছর পর্যন্ত) সময় লাগতে পারে।
- প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর, মাথাব্যথা ও ক্ষতস্থানে অস্বস্তি বা চুলকানি।
- পানি দেখলে প্রচণ্ড আতঙ্ক বা ভয় হওয়া (হাইড্রোফোবিয়া)।
- বাতাস দেখলে ভয় লাগা (এরোফোবিয়া)।
- অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ ও গিলতে সমস্যা হওয়া।
- মানসিক বিভ্রান্তি, খিঁচুনি এবং শেষ পর্যায়ে পক্ষাঘাত বা মৃত্যু।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সম্পর্কে আপনার অবশ্যই যা জানতে হবে
কখন জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে হবে?
১. পূর্ব সতর্কতামূলক (Pre-exposure Immunization): বিশেষত যেসব ব্যক্তি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত তারা এই ভ্যাকসিন নিতে পারেন। যেমন:
- পশু চিকিৎসক
- পশু গবেষণাগারের কর্মী
- বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মী
- শিকারী ও বন কর্মী
- শিশু, যারা জলাতঙ্ক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করে
ডোজ:
- প্রথম ডোজ: ০ দিন (Day 0)
- দ্বিতীয় ডোজ: ৭ দিন (Day 7)
- তৃতীয় ডোজ: ২১ বা ২৮ দিন (Day 21/28)
- বুস্টার ডোজ: প্রতি ৫ বছর অন্তর (যদি প্রয়োজন হয়)
২. কামড় বা আঁচড়ের পর (Post-exposure Immunization): যদি কোনো জলাতঙ্ক বাহক প্রাণী কামড় দেয় বা আঁচড় দেয়, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব ভ্যাকসিন নিতে হবে।
কামড়ের ধরণ অনুযায়ী চিকিৎসা
| ক্যাটাগরি | বর্ণনা | চিকিৎসা |
|---|---|---|
ক্যাটাগরি ১ |
প্রাণীর স্পর্শ, খাদ্য বা পানীয় লেহন | ভ্যাকসিন প্রয়োজন নেই |
ক্যাটাগরি ২ |
চামড়ার উপর আঁচড় বা চিরুনির দাগ |
ভ্যাকসিন দিতে হবে |
ক্যাটাগরি ৩ |
কামড়ের মাধ্যমে রক্তপাত | ভ্যাকসিন + ইমিউনোগ্লোবিউলিন |
ভ্যাকসিন নেওয়ার নিয়ম
- Day 0: প্রথম ডোজ
- Day 3: দ্বিতীয় ডোজ
- Day 7: তৃতীয় ডোজ
- Day 14: চতুর্থ ডোজ
- Day 28: পঞ্চম ডোজ
জন্ডিস: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়
ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রয়োগ
যদি কামড় গুরুতর হয় (ক্যাটাগরি ৩), তাহলে ভ্যাকসিনের পাশাপাশি Rabies Immunoglobulin (RIG) প্রয়োগ করতে হবে। RIG সরাসরি ক্ষতস্থানে প্রয়োগ করতে হবে এবং বাকি অংশ মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে।
কারা জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে পারবেনা?
- প্রি-এক্সপোজার বা সতর্কতামূলক জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর বা সংক্রমণ থাকলে দেওয়া যাবে না
- যাদের র্যাবিস ভ্যাকসিনে অ্যালার্জি আছে
পোস্ট-এক্সপোজার বা কামড়ানোর পরে ক্ষেত্রে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই কারণ জলাতঙ্ক একটি প্রাণঘাতী রোগ।
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে পারবে কী?
- জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন গর্ভবতী নারীদের জন্য নিরাপদ।
- স্তন্যদানকারী মা-ও প্রয়োজনে ভ্যাকসিন নিতে পারবেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- হালকা জ্বর
- ইনজেকশন স্থানে ব্যথা ও লালচে ভাব
- মাথা ঘোরা
- বমি বমি ভাব
- অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া (খুবই কম)
সংরক্ষণ
- ২°C থেকে ৮°C তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন ও ইমিউনোগ্লোবিউলিনের দাম (Price in Bangladesh)
বাংলাদেশে স্থানীয় ও আমদানিকৃত একাধিক ব্র্যান্ডের বিশ্বমানের র্যাবিস ভ্যাকসিন ও ইমিউনোগ্লোবিউলিন পাওয়া যায়:
১. র্যাবিস ভ্যাকসিন (Anti-Rabies Vaccine - ARV):
- Rabix-VC (Incepta Pharmaceuticals) — আনুমানিক ৪০০ - ৪৫০ টাকা (প্রতি ভায়াল)।
- Indirab (Incepta / Imported) — আনুমানিক ৪৫০ - ৫০০ টাকা।
- Vaxirab-N / Speeda — আনুমানিক ৪৫০ - ৫৫০ টাকা।
২. র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (Rabies Immunoglobulin - RIG):
- RabiGLOB / Equirab (গভীর কামড়ে ক্যাটাগরি-৩ আক্রান্তদের জন্য): প্রতি ভায়াল আনুমানিক ৬০০ - ১,০০০ টাকা (শরীরের ওজন অনুযায়ী ডোজ নির্ধারিত হয়)।
(উল্লেখ্য: ফার্মেসি বা ব্র্যান্ডভেদে দামের সামান্য তারতম্য হতে পারে।)
বাংলাদেশে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন পাওয়ার উপায়
যদি ফার্মেসি থেকে কিনে টিকা নেওয়ার সামর্থ্য না থাকে, তবে সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে এটি পাওয়া যায়:
১. সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (Infectious Diseases Hospital - IDH), মহাখালী, ঢাকা: এখানে ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে র্যাবিস ভ্যাকসিন ও ইমিউনোগ্লোবিউলিন দেওয়া হয়।
২. সকল জেলা সদর হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল: অধিকাংশ জেলা হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিখরচায় জলাতঙ্কের টিকা প্রদান করা হয়।
৩. উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: নির্দিষ্ট বেশ কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও বিনামূল্যে এই ভ্যাকসিন সার্ভিস চালু রয়েছে।
আক্রান্ত স্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও সতর্কতা
- সাবান ও পানি দিয়ে ধোয়া: কামড় বা আঁচড়ের সাথে সাথে আক্রান্ত স্থানটি অন্তত ১৫-২০ মিনিট ধরে প্রবহমান পানি এবং সাবান (ক্ষারযুক্ত সাবান বেশি কার্যকর) দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে ভাইরাসের লোড প্রায় ৮০-৯০% কমে যায়।
- অ্যান্টিসেপটিক প্রয়োগ: ধোয়ার পর পোভিডোন আইওডিন (Povidone-iodine) বা অ্যান্টিসেপটিক লোশন লাগাতে হবে।
-
যা করবেন না:
- ক্ষতস্থানে দ্রুত সেলাই দেওয়া বা ব্যান্ডেজ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা যাবে না।
- কাঁচা মরিচ, চুন, ঘি, রসুন, তেলের মতো কোনো ঘরোয়া উপাদান লাগানো যাবে না।
- ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে সময় নষ্ট করা সম্পূর্ণ বিপজ্জনক।
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের সতর্কতা
- গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান কাল: জলাতঙ্ক একটি নিশ্চিত মরণব্যাধি, তাই গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে এই ভ্যাকসিন গ্রহণে কোনো বাধা নেই। এটি পুরোপুরি নিরাপদ।
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ইনজেকশনের স্থানে হালকা ব্যথা, লালচে ভাব, সামান্য জ্বর বা শরীর ব্যথা হতে পারে যা সাধারণ ও সাময়িক।
জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা:
জলাতঙ্কের (Rabies) টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চলা জরুরি, যাতে টিকার কার্যকরিতা সঠিক থাকে এবং কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি না হয়।
টিকা গ্রহণকালীন প্রধান সতর্কতাসমূহ
- ডোজ বা শিডিউল সম্পূর্ণ করা: চিকিৎসক নির্ধারিত প্রতিটি ডোজ (সাধারণত পোস্ট-এক্সপোজার ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ০, ৩, ৭ এবং ১৪ বা ২৮তম দিনে) নির্দিষ্ট দিনেই নিতে হবে। কোনো ডোজ বাদ দেওয়া বা বিলম্ব করা যাবে না।
- শারীরিক অবস্থা জানানো: গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী মা কিংবা কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে (যেমন: ডায়াবেটিস, ক্যানসার বা কিডনির সমস্যা) আক্রান্ত হলে টিকা নেওয়ার আগে ডাক্তারকে জানাতে হবে। গর্ভাবস্থায় জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নেওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ।
- অন্যান্য ওষুধ: আপনি যদি কোনো অ্যালার্জি, স্টেরয়েড বা অনাক্রম্যতা হ্রাসকারী (Immunosuppressants) ওষুধ সেবন করেন, তবে তা চিকিৎসককে আগে থেকেই জানান।
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ: ইনজেকশনের স্থানে হালকা ব্যথা, লালচে ভাব, সামান্য জ্বর বা শরীর ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। তবে তীব্র অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া (শ্বাসকষ্ট, মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা) দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
- অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়ানো: কোর্স চলাকালীন অ্যালকোহল ও ধূমপান থেকে বিরত থাকা ভালো, কারণ এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি কোনো প্রাণীর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
Disclaimer: এই নিবন্ধটি কেবল স্বাস্থ্য সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত। যেকোনো প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment
We value your insights! Feel free to share your thoughts, ask questions, or provide feedback. Please keep comments relevant and respectful. Spam or promotional content will be removed.